February 23, 2024, 3:21 am

চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার শঙ্কা

চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার শঙ্কা

প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন ঢাকা ওয়াসার পদ্মা (যশলদিয়া) ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে পরীক্ষা ছাড়াই নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার করা হচ্ছে।পাইপলাইন স্থাপনের পর ইতিমধ্যে কয়েকটি পয়েন্টে পাইপ ফেটে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া ধলেশ্বরী নদীর কুচিয়া মোড়া তলদেশের পাইপ ভেসে উঠায় সংশ্লিষ্টদের শঙ্কা বাড়ছে। ৪২ মাসের প্রকল্পটি ৬৬ মাসেও আলোর মুখ দেখেনি।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর প্রায় ৪০ লাখ মানুষের পানির চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয়। ২০১৪ সালের প্রথমদিকে প্রকল্পের কাজ শুরু করে তা ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ করার কথা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যবহৃত পাইপ পরীক্ষা করে ব্যবহার করার কথা থাকলেও সেটা না করেই তড়িঘড়ি করে কাজ শুরু করা হয়। প্রকল্পটি ৪২ মাসে শেষ করার কথা থাকলেও ৬৬ মাসেও তা আলোর মুখ দেখেনিপদ্মানদী (যশলদিয়া) থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত পাইপলাইন বসানো হলেও ঢাকায় পানি সরবরাহ লাইন প্রস্তুত করা হয়নি। আবার যেনতেনভাবে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট প্রস্তুত করা হলেও সরবরাহ লাইন প্রস্তুত না হওয়ায় নগরবাসী কবে পদ্মার পানি পাবেন সেটা ওয়াসার সংশ্লিষ্টরাও পরিষ্কার করে বলতে পারছে না।এছাড়া ওয়াসা সংশ্লিষ্টদের অভিমত, জনগণের টাকায় নির্মিত এ মেগা প্রকল্প যেনতেনভাবে বাস্তবায়ন করায় যতদিন টেকসই হওয়ার কথা তার অর্ধেক সময়ও প্রকল্পটি টিকবে না। শুরু থেকে এ প্রকল্পের নিম্নমানের পাইপের প্রশ্ন থাকলেও তার কোনো সুরাহা না করেই প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে ওয়াসা। আর মেয়াদকালের সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়ানো হয়েছে।এ প্রসঙ্গে প্রকৌশলী ও পানি বিশেষজ্ঞ ম. ইনামুল হক বলেন, পদ্মার পানি শোধনাগার প্রকল্প একটি অবাস্তব প্রকল্প। ঢাকা ওয়াসার অপরিণামদর্শী এ প্রকল্প লেজেগোবরে অবস্থায় পড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পদ্মা থেকে পানি এনে ধলেশ্বরী এবং বুড়িগঙ্গা পার করে রাজধানীবাসীকে খাওয়ানো খুবই অবাস্তব প্রকল্প। এরপর ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হলে সেটার কী অবস্থা দাঁড়াবে, সেটা সহজে অনুমান করা যায়।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার পদ্মা (যশলদিয়া) ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্রজেক্টের পরিচালক প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পের নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে অনেকে কিছু গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছে, বাস্তবে যার কোনো ভিত্তি নেই।অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পের স্পেসিপিকেশন অনুযায়ী প্রকল্পের পাইপ না কিনে নিম্নমানের পাইপ কেনা হয়েছে। দুই হাজার কোটি টাকার পাইপ ক্রয়ে অন্তত ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। চুক্তি অনুযায়ী ২২ দশমিক ৫ মিলিমিটার পুরুত্বের পাইপ সরবরাহ করার শর্ত ছিল এবং ক্ষেত্র বিশেষে ১৯ দশমিক ২ মিলিমিটার পর্যন্ত বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে চীনা ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে ১৯ মিলিমিটার পুরুত্বের পাইপ আমদানি করেছে ওয়াসা। এ বিষয়ে সংক্ষুব্ধ এক নগরবাসী দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করেছেন। ১২ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে দুদক অনুরোধ করেছে। কিন্তু, এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ তদন্ত শুরু করে সময় বাড়িয়ে নিয়েছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, ওয়াসার পদ্মা (যশলদিয়া) ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের ব্যয় ৩ হাজার ৫০৮ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৪২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দেবে চায়না এক্সিম ব্যাংক। বাকি অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার ও ঢাকা ওয়াসা। ঋণের জন্য চীনের এক্সিম ব্যাংককে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হচ্ছে। প্রকল্পের সুবিধা না পেলেও শুরু থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ অর্থ রাজধানীরবাসীর কাছ থেকে পানির দাম বাড়িয়ে উঠানো হবে। পরবর্তী সময়ে আবার এ প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা করা হয়েছে।৫ জুলাই সরেজমিন, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পদ্মা নদীর পাড়সংলগ্ন যশলদিয়ায় ঢাকা ওয়াসার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্রজেক্ট ঘুরে এবং এলাকাবাসী, ঠিকাদার ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রকল্পের নানা অনিয়মের চিত্র জানা গেছে।এক ঠিকাদার জানান, প্রকল্পের শুরুতে মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হলেও কিছুদিন পর থেকে খুবই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার শুরু করা হয়। এরপর থেকে মানহীন সামগ্রী ব্যবহার করে কাজ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং ওয়াসার প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা একযোগে অনিয়ম করছেন।১ নম্বর ধলেশ্বরী সেতু এলাকার মুদি দোকানদার মোহাম্মদ মানিক, দেলোয়ার হোসেন ও আবদুল হক বলেন, ধলেশ্বরী নদীর কুচিয়া মোড়া অংশের ওয়াসার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্রজেক্টের পাইপ জাহাজের সঙ্গে বেঁধে ভেসে উঠে। পরে ওয়াসা সেখানে নতুন পাইপ স্থাপন করেছে। তারা জানান, এসব পাইপ নদীর তলদেশ দিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও তা না করায় এমন ঘটনা ঘটে।যশলদিয়া মাদবর বাড়ীর মোড় এবং আশপাশের এলাকায় প্রকল্পের পাইপ স্থাপনের সময় কয়েকটি পাইপ ফেটে যায়। এ বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দা মো. মমিনুর রহমান ও আয়ুব আলী বলেন, কয়েক মাস আগে এ এলাকায় পাইপ স্থাপনের সময় কয়েকটি পাইপ ফেটে যায়। যে মানের পাইপ দেয়ার কথা ছিল সে মানের পাইপ দেয়া হয়নি। এ কারণে পাইপগুলো ফেটে যায়। যশলদিয়ার মাদবর পাড়ার মজিবর রহমান জানান, এ এলাকায় নির্মিত ওয়াসার দোতলা ভবনটিতে ব্যবহারের আগেই ফাটল ধরেছে। ফাটলগুলো ওয়াসার ঠিকাদাররা নতুন করে সংস্কার করছেন। তিনি বলেন, নতুন ভবনের এ অবস্থা হলেও মাটির নিচ দিয়ে স্থাপিত পাইপে কত অনিয়ম করেছে তা সহজেই বোঝা যায়।বর্তমানে রাজধানীতে দৈনিক ২৩০-২৩২ কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর দৈনিক পানির উৎপাদন ক্ষমতা ২৪০-২৪২ কোটি লিটার। এরমধ্যে ভূ-গর্ভস্থ উৎস থেকে ৭৮ ভাগ এবং ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে ২২ ভাগ সংগ্রহ করা হচ্ছে। ২০২১ সালের মধ্যে এ চিত্র পাল্টে দেয়ার লক্ষ্যে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের সুদূর পদ্মা থেকে পানি শোধন করার প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। এ প্রকল্প থেকে দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার পানি আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।


Comments are closed.

© সাতক্ষীরা প্রবাহ
Design & Developed BY CodesHost Limited