July 13, 2024, 3:23 am

সাংবাদিক আবশ্যক
সাতক্ষীরা প্রবাহে সংবাদ পাঠানোর ইমেইল: arahmansat@gmail.com
নারীর প্রতি সহিংসতা : হাইকোর্টের রায় উপেক্ষিত

নারীর প্রতি সহিংসতা : হাইকোর্টের রায় উপেক্ষিত

সারা দেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধ কিছুতেই কমছে না। বরং সম্প্রতি তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ঘটছে লোমহর্ষক ঘটনা। ছাড়িয়ে গেছে পৈশাচিকতার সব সীমা। প্রভাবের বলয়, সুশিক্ষার অভাব, সমাজে বিচারহীনতা ও অপরাধীর
যথাযথভাবে শাস্তি কার্যকর না হওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ ঘটনা প্রতিরোধ ও প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের দেওয়া একটি ঐতিহাসিক রায় বাস্তবায়ন হয়নি ৯ বছরেও।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৯ মাসে দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৭৫টি। এ সময়ে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৮ জন নারী। এ ছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৩ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১২ নারী। এ ছাড়া ৯ মাসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১৬১ নারী। আর যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিন নারী এবং ছয় পুরুষ নিহত হয়েছেন। ৯ মাসের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়কালের মধ্যে সারা দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা, বিশেষত ধর্ষণ, হত্যা, যৌন নিপীড়ন ও পারিবারিক নির্যাতনের সংখ্যা এবং ঘটনার ধরনে ভয়াবহতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০ সেপ্টেম্বর সাভারে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় স্কুলছাত্রী নীলা রায়কে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে। ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে খাগড়াছড়িতে চাকমা সম্প্রদায়ের এক নারীকে গণধর্ষণের পাশাপাশি তার ওপর বর্বর নির্যাতন চালানো হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরীর টিলাগড় এলাকায় এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্থানীয় ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী স্বামীকে বেঁধে রেখে গৃহবধূকে গণধর্ষণ করে। ওই ঘটনায় সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তবে সব ঘটনাকে ছাপিয়ে যায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে স্বামীকে আটকে রেখে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন ও এর ভিডিও প্রকাশের ঘটনা। ভিডিওতে ওই নারীর আর্তচিৎকার নাড়িয়ে দেয় সারা দেশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই আসাদুজ্জামান খান কামাল এই ঘটনা সম্পর্কে বলেছেন, ‘বর্বরতার চরম সীমা দেখলাম।’ ধর্ষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মাঠে নেমেছে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। এ লোমহর্ষক ঘটনার প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি এলাকায় সাধারণ মানুষ গত তিন দিন ধরে রাজপথে বিক্ষোভ করছে। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া প্রত্যেকের দাবি এমন ঘটনার অবসান হতেই হবে। তারা প্রশাসনকে দায়ী করে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছেন।
এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে সরকার। কেননা জনগণের পক্ষ থেকে এ দাবি উঠেছে।’ আইনমন্ত্রী বলেন, ‘যেহেতু জনগণের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে, ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার, সেহেতু এটি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। কারণ আইন মানুষের জন্য।’
অন্যদিকে বুধবার ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়ায় দুই কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে চার কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। এদিন সকালে এক কিশোরকে ও মঙ্গলবার রাতে তিন কিশোরকে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে আটক করা হয়। আটক ওই চার কিশোরের বয়স ১৫-১৭ বছরের মধ্যে। সম্প্রতি হবিগঞ্জে মা ও মেয়েকে গণধর্ষণের ঘটনায় দেশে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর আগে রাজধানী ঢাকার ওয়ারী এলাকায় একটি বহুতল ভবনে নিজ বাসার ওপরের তলার ফ্ল্যাটে খেলতে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে সাত বছরের একটি মেয়ে। ঘটনাটি ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। এর আগে চলন্ত বাসে কিশোরগঞ্জে নার্স তানিয়া ও টাঙ্গাইলে রূপাকে গণধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। নারায়ণগঞ্জে একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ১১ মাদ্রাসাছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে মামলা হয়। ফেনীর সোনাগাজীতে যৌন হায়রানির পর পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সারা দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া সম্প্রতি সুবর্ণচরের চরজব্বার থানায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পর বাড়ি ফেরার পথে স্বামীকে আটকে রেখে গণধর্ষণ করা হয় এক নারীকে। খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে ষষ্ঠ শ্রেণির মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণ, ময়মনসিংহ জেলার ঈশ^রগঞ্জ রেলস্টেশনে কিশোরীকে গণধর্ষণ, নেত্রকোনার দুর্গাপুরে কিশোরীকে ধর্ষণ, গাইবান্ধার ফুলছড়িতে পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণ, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে সাত বছরের ছেলেকে যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো সারা দেশে ভয়াবহ হারে নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
অথচ নারীর প্রতি এ ধরনের যেকোনো ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে ও কঠোর শাস্তির বিধানসহ প্রতিরোধেরও ব্যবস্থার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে একটি ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। জনস্বার্থে করা একটি রিটে ২০১১ সালের ২৬ জানুয়ারি হাইকোর্ট ওই রায় দেন। রায়ে প্রস্তাবিত নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১০ (ক) ধারায় কিছু পরিবর্তন এনে এতে অ্যান্টি স্টকিং ল’ অন্তর্ভুক্ত করার জন্যও বলা হয়। এ ছাড়া ভিকটিম প্রটেকশন আইন করতে ও দেশের সবকটি থানায় এ সংক্রান্ত পৃথক সেল গঠনের জন্যও রায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। অথচ তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।
বিচারপতি মো. ইমান আলী ও বিচারপতি শেখ হাসান আরিফের হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া ওই রায়ে উল্লেখ করা হয়, ‘শুধু পাবলিক প্লেসে নয়, সব ধরনের যানবাহন, বাসাবাড়ি ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যৌন হয়রানির বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। দেশের প্রতিটি সাইবার ক্যাফেতে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে ও যারা ব্যবহার করবেন তাদের আইডি কার্ড দেখাতে হবে। অনুমোদন ছাড়া কোনো সাইবার ক্যাফে চলবে না। যৌন হয়রানির বিষয়ে প্রতিটি থানায় একটি আলাদা সেল গঠন করতে হবে, যারা প্রতি মাসে সংশ্লিষ্ট এসপি ও পুলিশ কমিশনারের কাছে রিপোর্ট করবে। প্রতিটি জেলায় এ সংক্রান্ত একটি ডেভেলপমেন্ট কমিটি গঠন করতে হবে, যার সদস্য হবেন মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সিভিল সোসাইটি এবং মহিলা ও শিশুদের নিয়ে কাজ করেন এমন এনজিওর সদস্যরা। ভিকটিম অ্যান্ড উইটনেস প্রটেকশন আইন দ্রুত পাস করতে হবে। এ আইন না হওয়া পর্যন্ত সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যৌন হয়রানির বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।’ হাইকোর্টের দেওয়া এসব নির্দেশের অধিকাংশই এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতাকে বিশ^ব্যাপী সমস্যা বলে আখ্যায়িত করে সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এক সেমিনারে বলেছেন, ‘আমাদের বর্তমান সমাজে নারী ও শিশু পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজন দ্বারাও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সবাইকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। নারী ও শিশুর অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সংবেদনশীল।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের রায় আছে। নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতন বন্ধে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।’ তিনি বলেন, ‘সত্যিকারের শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সমাজ হবে না, যদি না নারী ও শিশুর প্রতি সব ধরনের নির্যাতন সমূলে বন্ধ হচ্ছে। এটা আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে।’ ওই সেমিনারে বিচারপতি নাঈমা হায়দার বলেন, ‘ধর্ষণের শিকার নারী-শিশুদের শারীরিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে অবমাননাকর ‘টু-ফিঙ্গার টেস্ট’-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে উচ্চ আদালতের একাধিক রায় রয়েছে। বাংলাদেশসহ সারা বিশে^ নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।’
রিটকারী ফাহিমা নাসরিন মুন্নি এ বিষয়ে সময়ের আলোকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশ পালনে সবাই বাধ্য। অথচ যৌন হয়রানির বিষয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় সরকার বাস্তবায়ন করছে না। হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে এই স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় একে অন্যের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে বসে আছে। আর এ কারণেই দিন দিন বেড়ে চলেছে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা।’
নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার শাস্তির পাশাপাশি যারা এর শিকার তাদের কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে মানুষিক সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও নারী নেত্রী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম ফিরোজ। তিনি বলেন, সরকারের কঠোর অবস্থান ও সমাজের প্রতিটি ব্যক্তির সচেতনতাই পারে এসব ঘটনা প্রতিহত করতে।’
আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, ‘নারীর প্রতি যেকোনো সহিংস আচরণের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। সিলেট, সাভার ও নোয়াখালীর ঘটনায় অধিকাংশ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে প্রসিকিউশন টিম প্রস্তুত। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হবে।’ অন্যদিকে মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মনে করেন, ‘যদি আইনের শাসন দুর্বল হয়ে যায় তবে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকে। দেশে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে গেছে। দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণ হলো প্রভাবের একটি বলয় তৈরি হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার আইনের শাসনকে কোণঠাসা করে ফেলেছে।’


Comments are closed.

ইমেইল: arahmansat@gmail.com
Design & Developed BY CodesHost Limited
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com